Header Ads

The History of Santal Revolution

স্বাধীনতা আন্দোলন ও সাঁওতাল সম্প্রদায়

১৭৭৯ সালে ভাগলপুরের কালেক্টর অগাষ্টাস ক্লীবল্যাণ্ড বিদ্রোহী পাহাড়িয়াদের বশে এনে তাদের জন্য উপনিবেশ স্থাপন করেন। নাম দেন ‘দামিন-ই-কোহ্’। কিন্তু পাহাড়িয়ারা সেখানে থাকতে রাজি হল না। এদিকে সাঁওতাল বিদ্রোহী তিলকা মুরমু (মাঞ্জহি)-র তীরের আঘাতে ক্লীবল্যাণ্ডের মৃত্যু হওয়ায় ‘দামিন-ই-কোহ্’-র ভার দেওয়া হয় দেশীয় কর্মচারী আব্দুল রসুল খাঁ-র উপর। পাহাড়িয়ারা সেখানে থাকতে রাজি না হওয়ায় ১৭৯০ সালে ‘দামিন-ই-কোহ্’তে ‘হড়’ অর্থাৎ সাঁওতালদের প্রবেশ করতে দেওয়া হল। বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্ক এর আদেশে ‘দামিন-ই-কোহ্’র সীমানা বেড়ে যাওয়ায় দলে দলে সাঁওতালগন কটক, ধলভূম, মানভূম, বরাভূম, ছোটনাগপুর, পালামৌ, হাজারিবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে দামিনে বসবাসের জন্য আসতে লাগল। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল সাঁওতাল পল্লী। গ্রামের পর গ্রাম। গড়ে উঠল সাঁওতালদের সুখের জীবন, শান্তির জীবন। সাঁওতালদের এই জীবনে কখন যে কোম্পানী মদতপুষ্ট মহাজন ও ব্যবসায়ীরা ঢুকে পড়ল তা তারা বুঝতেই পারেনি। ক্রমশ শুরু হল সাঁওতালদের উপর ভয়ঙ্কর শোষণ ও অত্যাচার। পাশাপাশি কোম্পানির অর্থলোভি কর্মচারীরা খাজনা আদায়ের নামে অবাধে ধন সম্পদ লুট করতে লাগল। ফলস্বরূপ, অসহনীয় শোষণ যন্ত্রনার হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য সাঁওতালরা বেছে নিল সংগ্রামের পথ। এই সংগ্রাম বা ‘হুল’-এর নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে এল ভগনাডিহির চার ভাই —সিদু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব। সিদু-কানু ‘গিরৗ’র (ধর্মীয় আহ্বান) ডাকে ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন ভগনাডিহির মাঠে প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল একত্রিত হয়ে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানে বিদ্রোহের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
৭ই জুলাই দিঘি থানার দারোগা মহেশলাল দত্ত ও মহাজন কেনারাম ভকত মিলে মিথ্যা খুনের অভিযোগে পীপড়া গ্রামের হাড়মা মাঞ্জ‌হি এবং জমি না দেওয়ার অপরাধে আমগাছিয়া গ্রামের গর্ভু মাঞ্জ‌হিকে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সিদু-কানুর লোকজন পথ আটকে দাঁড়ায়। বাকযুদ্ধের ফলস্বরূপ সিধুর হুঙ্কার ও নির্দেশ পাবার সঙ্গে সঙ্গে গর্ভু মাঞ্জ‌হির কোপে মহেশ দারোগা এবং কেনারাম ভকত প্রাণ হারায়। এরপরই সাঁওতাল বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৫৫ সালের ১৭ই জুলাই মেজর ব্যারেজ এর বিশাল সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের লড়াই হল পিয়ালপুরে। এই লড়াই-এ সাঁওতালরা পাহাড়ের উপরে তিনটি ঘাটি তৈরী করেছিল। একটিতে ছিল চাঁদ ও তার দলবল, আরেকটিতে গর্ভু ও বিক্রম, অন্যটিতে সিধু ও কানু। তুমুল যুদ্ধে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের কাছে ইংরেজ সৈন্যের শোচনীয় পরাজয় ঘটে।
১৮৫৫ সালের অক্টোবর মাস। সংগ্রামপুরের যুদ্ধ। ইংরেজ সেনাপতি ফ্যাগুন বিদ্রোহী সাঁওতালদের পাহাড়ের উপর থেকে সমতলে নামিয়ে আনার জন্য কৌশল অবলম্বন করলেন কেন না পাহাড়ের উপর সাঁওতালরা অপরাজেয়। সেনাপতির নির্দেশে রেঞ্জার্স বাহিনীর সৈন্যরা পাহাড়ের দিকে এগোতে থাকায় সিধু-কানুর নির্দেশে সাঁওতালরা একযোগে তীর ছুঁড়তে লাগল। ওপাশে, সেনাপতিও ফায়ারের নির্দেশ দিলেন কিন্তু আশ্চর্য, বন্দুকের গুলি সাঁওতালদের গায়ে লাগছে না। বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজকে সাঁওতালরা দেবতার আশীর্বাদ ভেবে হাজার হাজার সাঁওতাল পাহাড়ের উপর থেকে সমতলে নামতে লাগল। ইংরেজ সৈন্যও পিছু হটতে লাগল। এভাবে সাঁওতালরা সমতলে নেমে এল। তখনই সেনাপতি ফ্যাগুনের নির্দেশে গর্জে উঠল কামান-বন্দুক। দলে দলে সাঁওতাল মৃত্যুবরণ করল। তাজারক্তে ভেসে গেল সংগ্রামপুরের সবুজ মাঠ। ইংরেজ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধে সাঁওতালদের পরাজয় ঘটে।
১৮৫৫ সালের ১০ই নভেম্বর সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে ‘মার্শাল ল’ (Martial law) জারি হয়।
১৮৫৫ সালের ৩রা জানুয়ারী ‘মার্শাল ল’ তুলে নেওয়া হয়। ১৮৫৬ সালের ২৭শে জানুয়ারী ভাগলপুর হিল রেঞ্জার্সের সঙ্গে যুদ্ধেও সাঁওতালদের পরাজয় ঘটে।
১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সপ্তাহে সিধু-কানুর ফাঁসি হয় ৷ কেউ কেউ বলেন, সংগ্রামপুর যুদ্ধেই কানুর মৃত্যু হয়।
এই বিদ্রোহের যে সমস্ত সাঁওতাল কারাবরণ করেছিল তাদের নাম (সরকারী রেকর্ড অনুযায়ী)—
♦ নলহাটি থানার-
* গেরিয়াপানি গ্রামের—
১) জগ্গু মাঝি ২) দুর্লভ মাঝি ৩) দানু মাঝি ৪) বলরাম মাঝি ৫) মুরিয়া মাঝি ৬) চুন্দ্রী মাঝি ৭) রণজিৎ মাঝি ৮) মুংলে মাঝি ৯) সোনা মাঝি ১০) মুটি মাঝি ১১) মাঙ্গাস মাঝি ১২) নিমাই মাঝি ১৩) শ্যাম মাঝি ১৪) মেঘরাম মাঝি ১৫) ডোমন মাঝি ১৬) রাম মাঝি ১৭) বার্শা মাঝি ১৮) রমন মাঝি ।
* কোটাপোবারিয়া গ্রামের—
১) দোলেন মাঝি ২) শীতল মাঝি ৩) বিরসিং মাঝি ।
♦ লাঙ্গুলিয়া থানার-
* আসনা গ্রামের—
১) সিংরায় মাঝি।
মাসানজোর গ্রামের—
১) পারাশ মাঝি ২) চন্দ্র মাঝি ৩) সলখো মাঝি ।
কাটনা গ্রামের—
১) সিংরায় মাঝি ।
♦ আফজলপুর থানার-
* তিলাবুনি গ্রামের—
১) কাঞ্চন মাঝি ২) লাখন মাঝি ৩) কালু মাঝি।
* বাগঙ্গা গ্রামের—
১) কর্ণ মাঝি ২) রাই মাঝি।
* লেওনেবোনা গ্রামের—
১) বগাজ মাঝি।
* তেলাবাদ গ্রামের—
১)বিশু মাঝি।
♦এক বছর করে যাদের হাজতবাস হয়েছিল—
১) অর্জুন মাঝি ২) খরদু মাঝি ৩) নিতা মাঝি ৪) রঘু মাঝি ৫) কউর মাঝি ৬) লখি মাঝি ৭) পুসা মাঝি ৮) ভাদু মাঝি ৯) রূপনাথ মাঝি ১০) দুর্গা মাঝি ১১) গুরুদা মাঝি ১২) ভাদু মাঝি ১৩) গুরনা মাঝি ১৪) নীলু মাঝি ১৫) সুকা মাঝি ১৬) পুরকু মাঝি ১৭) উনপা মাঝি ১৮) সগ্রাম মাঝি।
♦ দশ বছর করে যাদের হাজতবাস হয় তাদের নাম—
১) বাগদু মাঝি ২) লিকা মাঝি।
অনেক সাঁওতাল বিদ্রোহীদের দ্বীপান্তরও হয়। এদের নাম ইতিহাসের অন্ধকার কারাগারে এখনও বন্দী। সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রভাবে ও অনুপ্রেরণায় ১৮৫৭ সালে সংগঠিত হল ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ যাকে ভারতীয় ঐতিহাসিকগণ ভারতবর্ষের বুকে প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে যে ইতিহাস লেখা হবে তা নিশ্চয়ই অন্য কথা বলবে।
লেখক —পরিমল হেমব্রম (ইতিহাসবিদ)
সূত্রঃ লাহান্তি পত্রিকা

No comments

Powered by Blogger.